মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

অন্যের বউ নিয়ে পালিয়েছে শ্যালক, সহযোগিতা করায় দুলভাই খুন!

Reporter Name / ৫৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টারঃ ডিসিস্ট মঙ্গল সরদার। বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানাধীন জলিরপাড় বাজারে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। একই বাজারে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা করতেন তার শ্যালক ক্রিটি। ব্যবসায় ভালো করার কারণে একটি ট্রাক কিনতে চেয়েছিলেন ক্রিটি। সে কারণে আল-আমিন নামে এক ব্যক্তিকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আল-আমিন তাকে ট্রাক তো কিনে দেননি, টাকাও ফেরত দেননি। নিজের পাওনা টাকা বার বার তার কাছ থেকে ফেরত চেয়েও পাচ্ছিলেন না ক্রিটি।টাকা নিয়ে ঝামেলার মাঝেও একই এলাকার সুশান্তের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক চলছিল ক্রিটির। একদিন প্রেমিকাকে ভাগিয়ে নিয়ে দুলাভাই ডিসিস্ট মঙ্গল সরদারের বাসায় অবস্থান নেন তিনি। পরবর্তীতে প্রেমিকাকে নিয়ে ক্রিটি ভারত চলে যান। যাওয়ার আগে আল-আমিনকে বলে যান, তার পাওনা টাকা যেন দুলাভাই মঙ্গল সরদারকে দিয়ে দেন।

শ্যালক ক্রিটির এই ৩০ লাখ পাওনা টাকা উদ্ধার এবং সুশান্তের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিতে সহায়তা করাই কাল হয় ডিসিস্ট মঙ্গল সরদারের। গত ১১ সেপ্টেম্বর খুন করা হয় তাকে। পরে ১২ সেপ্টেম্বর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মঙ্গলের মরদেহ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল আসামিসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।হত্যা মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র এবং মামলা সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যেভাবে করা হয় হত্যার পরিকল্পনা

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গল সরদারের শ্যালক ক্রিটি ও আল-আমিনের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়। আল-আমিন ক্রিটিকে ৩০ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ার জন্য ভয় দেখাতেই থাকেন। অন্যদিকে ক্রিটি সুশান্তের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার সময় দুলাভাই মঙ্গল সরদারকে টাকাগুলো দিতে বলেছিলেন। তাই মঙ্গল সরদার বারবার টাকার জন্য আল-আমিনকে তাগাদা দেন।

অপর দিকে স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে ক্রিটিকে সহযোগিতা করায় মঙ্গলের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন সুশান্ত। যার ফলে আল-আমিন তার রাইস মিলে সুশান্তকে নিয়ে মঙ্গল সরদারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আল-আমিন তার সহযোগী আসামি কালাম, সবুজ, মনোজ, আকবর, মুশিয়ার, নাজমুল, লিটন ওরফে লিটু শেখসহ জলিরপাড় বাস স্ট্যান্ডে আলোচনায় বসেন। সেখানে আসামি আল-আমিন, মঙ্গল সরদারকে হত্যা করার জন্য আসামি কালাম, সবুজ, মনোজ, আকবর, লিটু মিয়া, মুশিয়ার প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেন।

যেভাবে মঙ্গল সরদারকে হত্যা

পিবিআই এবং মামলা সূত্রে জানা যায়, পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ১১ সেপ্টেম্বর মঙ্গল সরদারকে ডেকে নিয়ে সিন্ধিয়া বাজারে সুশান্তের কাঠের দোকানে যান। এ সময় আল আমিন, কালাম, মনোজ, সবুজ, আকবর, লিটু, মুশিয়ার, নাজমুল তার সঙ্গে ছিলেন। সেখানে সবাই একসঙ্গে চা পান করে সিদ্ধিয়া বাজার হতে জলিরপাড়ের দিকে হেঁটে রওনা দেন। তাদের সঙ্গে সুশান্তও আসেন। ঘটনাস্থল সিন্ধিয়া বাজার হতে ১ কিলোমিটার পশ্চিমে উল্লাবাড়ীর সামনে ফাঁকা জায়গায় পৌঁছানো মাত্র আসামি সবুজ ডিসিস্ট মঙ্গল সরদারের মুখ চেপে ধরেন। অন্য সকলে মিলে লোহার পেরেক, লাঠি, ইট দিয়ে আঘাত করে মঙ্গল সরদারকে হত্যা করেন। সবার শেষে আল-আমিন ইট দিয়ে ডিসিস্ট মঙ্গল সরদারের মুখে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর রাত অনুমানিক ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সুশান্ত সহ অন্যান্য আসামিরা লাশ পাটের বস্তায় ভরে কুমোদ বাগচির হলুদ ও ধান ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে ফেলে দেন।

যেভাবে মিলল মঙ্গল সরদারের লাশ

মঙ্গল সরদার হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন মঙ্গল প্রতিদিনের মতো দুপুর ২টার দিকে জলিরপাড় বাজারে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি হতে বের হন। সন্ধ্যা অবধি বাড়িতে না আসলে পরিবারের লোকজন তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তারা বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন।গত ১২ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে মঙ্গলের পরিবারের লোকজন সংবাদ পান, দক্ষিণ জলিরপাড় সাকিনস্থ কুমোদ বাগচীর ধান ক্ষেত ও হলুদ ক্ষেতের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় ঘাসের উপর মঙ্গল সরদারের লাশ হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পিবিআইয়ের এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান

পিবিআই ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ থেকে জানা গেছে, এই ঘটনার পরে নিহত মঙ্গল সরদারের ভাতিজা দুলাল সরদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মুকসুদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-১০।গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানা পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠায়। তদন্তে নেমে সন্দ্বিগ্ধ আসামি নাজমুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে ৩ দিনের হেফাজতে নেয় পুলিশ। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করেন।মুকসুদপুর থানা পুলিশের দীর্ঘ ৩ মাস তদন্তাধীন সময়ে অত্র মামলার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিষয়ে কোনো রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপারের মাধ্যমে মামলাটি পিবিআই/সিআইডি দ্বারা তদন্তের জন্য পুলিশ হেডকোয়াটার্স এ আবেদন করে। পুলিশ হেডকোয়াটার্স মামলাটি পিবিআই গোপালগঞ্জ জেলাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের তত্ত্বাবধানে পিবিআই গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদের দিক নির্দেশনায় একটি বিশেষ টিম এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য অভিযানে নামে।পিবিআইয়ের এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল-আমিন শেখের নেতৃত্বে দীঘিনালা থানা পুলিশের সহায়তায় পিবিআই’র একটি টিম দুদিনের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করে।অভিযানকালে তারা গত ১ জানুয়ারি সকাল ১১ টায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানাধীন রশিদনগরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে ঘটনায় জড়িত মূল আসামি কালাম শিকদারতে (৫২) গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার জলিরপাড় এলাকা থেকে ওই রাতেই অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিবিআই গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানা এলাকা থেকে মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই’র একটি টিম। পরে সেদিনই রাত ১০টার দিকে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার জলিরপাড় এলাকা থেকে অভিযান পরিচালনা করে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্যরা হলেন- মো. লিটন শেখ ওরফে লিটু (৫২), আকবর শেখ (৪৮), মো. মুশিয়ার শেখ (৫৮)।পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার আসামি কালাম শিকদার এবং আসামি মো. লিটন শেখ ওরফে লিটু সহযোগী অন্যান্য আসামিদের নাম প্রকাশ করে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এছাড়া অপর দুই আসামি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। আরও তথ্য উদঘাটনের জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।’

গভীর পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন কালাম

পিবিআই গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশের এসআই ও মামলাটির বর্তমান কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ বলেন, ‘মঙ্গল সরদার হত্যার ঘটনার প্রায় তিন মাস পরে যখন পিবিআই তদন্তে শুরু করে তখন কালাম পালাতে চেয়েছিলেন ভারতে। পরে খাগড়াছড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আরও কোনো মামলা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত অন্যান্য সহযোগী আসামিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত আছে বলে তিনি জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর