বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সংবাদ শিরোনাম :

অভাব-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা পলি রাণীর গল্প

Reporter Name / ১০৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

জাগো-দেশ, প্রতিবেদকঃ আর্থিক অনটন আর চরম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সেই নারীই হলেন এখনকার মাইক্রোবাস ড্রাইভার পলি রাণী বিশ্বাস (৩৫)। ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর থানার বলুহর গ্রামে বাবা সুকুমার রায় ও মা পূর্ণিমা রাণী বিশ্বাসের ঘরে জন্ম পলি রাণী বিশ্বাসের। পড়াশোনা করেছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম। অভাব, অনটন ও নির্যাতন সব মিলিয়ে পলি রাণীর বেড়ে ওঠা মামা বাড়িতে। পলির মামা বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের ব্রক্ষনীনগর গ্রামে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিশুকাল থেকেই বাবার ভালোবাসা থেকে ছিটকে পড়ে পলিকে চলে আসতে হয় মামার বাড়িতে। জন্মের চার বছর পর পলির বাবা পলির মাকে ছেড়ে দিয়ে নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পলির জন্মের পর পলির মা শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হন। এক সময় পলির মায়ের হাঁপানিসহ
হাত-পায়ে ঘায়ের সৃষ্টি হয়। যে কারণে পলির ঠাকুর মা গ্রামের লোকের কাছে বলে বেড়াতেন ওর বড় ধরনের অসুখ হয়েছে। এই সুযোগে গ্রামের লোকজন বলতে লাগল পলির মাকে আর গ্রামে রাখা যাবে না। কারণ পলির মায়ের যে রোগ হয়েছে তা ছোঁয়াচে। যার চিকিৎসা নেই। যদি সে এই বাড়িতে থাকে তবে সবাই ওই রোগে আক্রান্ত হবে। তাই পলির ঠাকুর মা ছেলেকে বউ ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
পলির বাবা স্ত্রীসহ পলিকে নিয়ে পলির মামা বাড়িতে বেড়াতে আসেন। পলির মামা বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের ব্রক্ষনীনগর গ্রামে। পলির বাবা দুই দিন শ্বশুর বাড়িতে থাকার পর রাতের আধারে পালিয়ে যান। পলির মা তীর্থের কাকের মতো স্বামীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকেন। মা শিশু পলিকে বলতেন তোর বাবা ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে চলে আসবে। কিন্তু সেই আসাটা আর হয়নি। দিন, মাস, বছর গত হলো কিন্তু পলির বাবা আর আসলো না। মা-মেয়ে মামার ঘাড়ের বোঝা হয়ে রইল। মামা হরিপদ এর সামান্য রোজগারে মা-মেয়ের খাবার ও চিকিৎসা চলত। ২ বছর পর মামা বিয়ে করেন। পলির ভাবনা ছিল মামি অনেক আদর করবে। কিন্তু সেটাও কপালে সইল না। মামির শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলত পলির ওপর। তিন বেলা ঠিকমতো মা-মেয়েকে খেতে দিত না। ৬ বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী পলিকে তার মা সান্ত্বনা দিত একদিন আমাদের কপালে সুখ আসবে বলে। গ্রামের লোকদের সহযোগিতায় পলি পড়াশোনা করত। সেটাও মেনে নিতে পারেনি মামি। মামি বলতেন পলি আর তার মা আমার বাড়ির কাজের লোক। পলির মামা বাড়িতে ধান, গম ভাঙানো মেশিন
কিনলেন। পাশাপাশি রাতে মাছ ধরতেন মামা। মামাকে সহযোগিতা করতে পলি স্কুল থেকে এসে মেশিনে ধান, গম ভাঙতো আর রাতে মামার সঙ্গে মাছ ধরতে যেত। তারপরও মামির মন গলেনি। পলি ও তার মায়ের ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। মামা চুরি করে পলির মায়ের জন্য ওষুধ কিনে আনতেন। মামি ওষুধ
দেখে ফেললে সেই দিন আর মা-মেয়ের কপালে ভাত জুটত না। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ভাত চেয়ে এনে পলিকে তার মা বলতেন, আমি খেয়েছি এবার তুই খা। প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে পলি মামার ধান ছাঁটাই মিলে কাজ করত। রাতে মামার শার্ট পরে মাছ ধরতে যেত। যাতে কেউ বুঝতে না পারে পলি
একটা মেয়ে। রাতের বেলায় ধরা মাছ বিক্রি করে মামা পলিকে ৫থেকে ১০ টাকা দিতেন। ওই টাকা জমিয়ে রাখতেন পলি। ৩ বছর পর পলির বয়স যখন ১৩ বছর তখন পলি কিছু করবার চেষ্টা করেন। প্রাইভেট পড়িয়ে ২শ টাকা পেতেন। স্কুল বন্ধ হলে।পরের বাড়িতে কাজ করতেন। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জামাকাপড় এনে পরতেন পলি। আর নিজে যে টাকা আয় করতেন তা দিয়ে মায়ের ওষুধ কিনতেন। প্রতিবেশীরা পলির কষ্ট দেখে একদিন জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থায় ফ্রি সেলাই প্রশিক্ষণ শেখার ব্যবস্থা করলেন। কাজ শেখ হলো কিন্তু সেলাই মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না পলির। স্কুলে যাওয়ার পথে একদিন ব্র্যাকের এক কর্মী পলিকে কাজ দেওয়ার কথা বলে সেখানে নিয়ে গেলেন। সেখানে স্বাস্থ্য সেবিকার কাজ পেল পলি। ব্র্যাকের কর্মকর্তারা পলির
কাছে সব ঘটনা শুনে পলিকে বললেন আপনি মাঝে মাঝে স্কুলে যেতে পারবেন। অফিস চলাকালীন দুই ঘণ্টা পড়তেও পারবেন। সেখান থেকে যা আয় হতো তা দিয়ে নিজের পড়াশোনা ও মায়ের চিকিৎসা খরচ চলত। এভাবে পার হলো আরও
২ বছর। এরপর পলি খবর পেল কেয়ার বাংলাদেশ নামে একটি দাতা সংস্থা
মেয়েদের ফ্রি গাড়ি চালানো প্রশিক্ষণ দেবে এবং চাকরি দেবে। পলি তার মাকে বিষয়টি জানাল। মেয়ে মানুষ হয়ে গাড়ি চালাবে একটু ভয় লাগলেও পলির মা রাজি হয়ে গেলেন। পলি ড্রাইভিং শিখলেন। ছয়মাস ট্রেনিং শেষে পলি সেখানে ড্রাইভিং এর চাকরি পেলেন। কেয়ার বাংলাদেশ পলিকে চাকরি দিয়ে রংপুরে বদলি করে দিল। তখন পলির বয়স ১৯। রংপুরে চাকরি করবার সময় ২০০৭ সালে পলির বিয়ে হয় নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ডালিয়াত গ্রামে।
বিয়ের পর স্বামী ও দুই সন্তানসহ মাকে নিয়ে পলি ভালো ছিলেন। ২০১৬ সালে পলির মা মৃত্যুবরণ করেন। নিজ টাকায় মায়ের সৎকার করেছেন পলি। নিজ সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও দিচ্ছেন। ভালো আছেন পলি। পলি রাণী বিশ্বাস বর্তমানে খুলনায় থাকেন এবং কেয়ার বাংলাদেশের গাড়ি চালান। পলি রাণী বিশ্বাস বলেন, কোনো কাজই ছোট নয়। কষ্ট করলে সুফল মেলে। সাহস থাকলেই এগিয়ে যাওয়া যায়। এ সমাজে অসহায়ের পাশে দাঁড়াবার মতো অনেক ভালো মানুষ রয়েছে। লোহাগড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মৌসুমী রাণী মজুমদার বলেন, চরম অভাব, অনটন, নির্যাতন ও অবহেলায় বেড়ে ওঠা পলি রাণী বিশ্বাস কখনো দমে যাননি। এ সমাজে নিজের জায়গা করে নিতে অদম্য গতিতে ছুটে চলেছেন তিনি। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা মেয়ে পলি আজ ড্রাইভিংয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পলিকে সম্মান জানাই। তিনি আরও জানান, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীন পলি রাণী বিশ্বাস ২০১৭ সালে লোহাগড়া উপজেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন। এখনো কোনো নারী অবহেলিত, নির্যাতিত থাকলে আমরা তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সব রকম সহযোগিতা করব। ‘পলিদের জন্য আমাদের দোয়ার সব সময় খোলা’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর